শ্যামনগর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মিয়াপাড়া নদী। নদীর ওপারে কবরস্থান। সেই কবরস্থানকে ঘিরে বহুদিন ধরেই শোনা যায় ভয়ঙ্কর গল্প। মানুষ বলে, রাতে কবরস্থানে গেলে অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যায়। কেউ কেউ দাবি করে, সাদা পোশাকের ছায়ামূর্তি নাকি কবরের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।
একদিন সন্ধ্যায়, গ্রামের ছয় বন্ধু—কাবারুল, সাবির মোলনা, ইমতাজ, রহিম, শুভ, আর তান্ত্রিক জব্বার—এই রহস্যের সমাধান করতে মনস্থ করল। তান্ত্রিক জব্বার একটু বয়স্ক, গ্রামের লোকেরা তাকে সম্মান করে, কারণ তার নাকি অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে অনেক জ্ঞান।
তাদের মধ্যে কাবারুল ছিল সবচেয়ে সাহসী। সে বলল, "আমরা সবাই শুধু গল্প শুনি। কেউ সাহস করে কিছু করিনি। আজ রাতে আমরা যাব, সত্যিটা জানবো।"
সাবির মোলনা ভয়ে বলল, "আমি শুনেছি, ওখানে গেলে কেউ ফিরে আসে না। এটা কি ঠিক করছি?"
তান্ত্রিক জব্বার বলল, "আমার মন্ত্র আর যজ্ঞ সব প্রস্তুত। আমরা সবাই মিলে গেলে কিছুই হবে না।"
রাত বাড়তে শুরু করল। ছয়জন একটি নৌকায় চেপে মিয়াপাড়া ঘাট পার হয়ে কবরস্থানের দিকে রওনা দিল। নদী শান্ত ছিল, কিন্তু অদ্ভুত শীতল বাতাস তাদের চারপাশে ঘুরতে লাগল।
কবরস্থানে পৌঁছানোর পর, তারা দেখল চারদিকে গভীর অন্ধকার। শুধু এক কোণে কুয়াশার মতো কিছু একটা নড়তে দেখল কাবারুল। ইমতাজ ফিসফিস করে বলল, "ওটা কী? কুয়াশা, নাকি...?"
তারা এগিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ করে এক কবরের পাশ থেকে কর্কশ এক আওয়াজ শোনা গেল। শুভ বলল, "আমার মনে হচ্ছে আমরা ফিরে যাই।"
কিন্তু কাবারুল এগিয়ে গেল। সে দেখল, একটা পুরনো কবরের মাটি খুঁড়ে বের হয়ে আসছে সাদা পোশাকের একটা মূর্তি। সবাই থমকে গেল।
তান্ত্রিক জব্বার দ্রুত তার ঝুলি থেকে তাবিজ আর আগুন বের করে মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করল। সেই মূর্তি তাতে আরো অস্থির হয়ে উঠল। জব্বার বলল, "এই আত্মা খুব পুরনো। এটি অভিশপ্ত। আমাদের সবাইকে শক্ত থাকতে হবে।"
রহিম কাঁপতে কাঁপতে বলল, "কিন্তু আমরা এর থেকে মুক্তি পাবো কীভাবে?"
জব্বার বলল, "এই আত্মা তার কবর থেকে উঠে আসার কারণ আছে। আমরা জানতে পারলে তাকে শান্ত করতে পারব।"
তারা মাটি খুঁড়ে দেখল, কবরের নিচে একটা পুরনো তালাবন্ধ বাক্স। জব্বার বাক্স খুলে দেখল, তার ভেতরে একটা পুরনো মুদ্রা আর একখানা চিঠি। চিঠিতে লেখা, "আমি বিনা কারণে হত্যা হয়েছি। আমার বিচার চেয়েছিলাম, পাইনি।"
তারা গ্রামে ফিরে এসে মসজিদের ইমামের কাছে কবরস্থানের আত্মার গল্প বলল। পরের দিন গ্রামের মানুষ মিলে সেই হত্যার বিচার নিয়ে আলোচনা শুরু করল।
কাবারুল ও তার বন্ধুরা বুঝতে পারল, মিয়াপাড়া কবরস্থানের আত্মা শুধু তার সত্যটা চেয়েছিল। বিচার শেষ হওয়ার পর, কেউ আর কখনো ওই কবরস্থানে ভূতের ছায়া দেখেনি। তবে সেই রাতের অভিজ্ঞতা ছয় বন্ধুর মনে আজীবন ভয়ের গল্প হয়ে থেকে গেল।