মাসুদ রানা ছিল গ্রামের শান্ত ও কৌতূহলী ছেলে। তার শখ ছিল ইতিহাস আর রহস্য খুঁজে বের করা। শ্যামনগরের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সে প্রায়ই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করত। তার বন্ধুরা—সাবির মোলনা, কাবারুল, নাসিম (যার ইউটিউব চ্যানেলে ব্লগ বানানো প্যাশন), জব্বার, আর কবির—সবাই তাকে এইসব অভিযানে সঙ্গ দিত।
একদিন মাসুদ রানা পরিকল্পনা করল, তারা মুর্শিদাবাদ আর পলাশি ভ্রমণে যাবে। তাদের লক্ষ্য ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার পলাশির যুদ্ধস্থল আর মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদের অজানা গল্পগুলো অনুসন্ধান করা। এই যাত্রার ভিডিও নাসিম তার ইউটিউব চ্যানেলের জন্য রেকর্ড করবে।
রহস্যের শুরু: মুর্শিদাবাদ
মুর্শিদাবাদ পৌঁছে তারা প্রথমে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ ঘুরতে গেল। প্রাসাদের অদ্ভুত নকশা আর ইতিহাস তাদের মুগ্ধ করল। গাইড তাদের বলল, "এই প্রাসাদে অনেক পুরনো কাহিনি আছে। কেউ কেউ বলে, রাতে এখানে অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যায়।"
কাবারুল বলল, "এগুলো হয়তো গাইডদের বানানো গল্প। সত্যি তো কিছু নেই।"
তবে মাসুদ রানা এই গল্পগুলো নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিল। তারা প্রাসাদ ঘুরে দেখতে দেখতে একটি পুরনো দরজা পেল। দরজার উপর "বন্দ" লেখা ছিল। সাবির মোলনা বলল, "এটা হয়তো স্রেফ স্টোররুম। এখানে ঢোকা নিষেধ।" কিন্তু মাসুদ রানা এবং নাসিম জেদ ধরে দরজার ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দরজার ভেতরে অন্ধকার ছিল। টর্চের আলো ফেলে তারা দেখতে পেল একটা ছোট ঘর, আর ঘরের মধ্যে একটি পুরনো তলোয়ার রাখা। তলোয়ারটি দেখে মনে হচ্ছিল, এটি বহু পুরনো এবং কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে ব্যবহৃত। নাসিম ভিডিও রেকর্ড করতে লাগল। হঠাৎ, ঘরের মধ্যে একটা ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল।
কাবারুল বলল, "আমি মনে করি, এখানে আর থাকা উচিত না।"
তারা তলোয়ারটি ফেলে রেখে দ্রুত বেরিয়ে এল। কিন্তু সবাই বুঝল, কিছু একটা অস্বাভাবিক।
পলাশির পথে বিপদ
মুর্শিদাবাদ থেকে তারা পলাশির পথে রওনা দিল। পথিমধ্যে নাসিম তার ভিডিও এডিট করতে গিয়ে দেখল, তলোয়ার ঘরের দৃশ্যগুলোতে কিছু অদ্ভুত ছায়া দেখা যাচ্ছে। নাসিম এ কথা সবাইকে বলল, কিন্তু কেউ গুরুত্ব দিল না।
পলাশির যুদ্ধস্থলে পৌঁছে তারা দেখতে পেল বিশাল একটি ফাঁকা ময়দান। গাইড তাদের বলল, "এখানেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিল। কেউ কেউ বলে, রাতে এখানে অশরীরী সেনাদের আওয়াজ শোনা যায়।"
কবির বলল, "এসব অলীক গল্প। ভূত বলে কিছু নেই।"
তারা সন্ধ্যার পরও সেখানে থেকে গাইডের গল্পগুলো শুনছিল। হঠাৎ, তাদের চারপাশে অদ্ভুত শীতল বাতাস বইতে লাগল। নাসিম তার ক্যামেরা চালু করে সেই মুহূর্ত রেকর্ড করতে লাগল।
অশরীরী উপস্থিতি
রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা শুনতে পেল মৃদু তলোয়ারের ঝনঝনানি আর ঘোড়ার পায়ের শব্দ। সবাই ভয় পেয়ে গেল। তান্ত্রিক জব্বার বলল, "আমি কিছু মন্ত্র জানি। আমাদের দ্রুত এখান থেকে বের হতে হবে।"
কিন্তু মাসুদ রানা বলল, "আমাদের ভয় পেলে চলবে না। আমি মনে করি, এই স্থানে কোনো কিছু আমাদের ডাকছে। আমরা সেই তলোয়ার আর এই জায়গার মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করব।"
তারা পলাশির মাঠের মাঝখানে একটা পুরনো কুয়ো খুঁজে পেল। কুয়োর মধ্যে কিছু একটা চকচক করতে দেখা যাচ্ছিল। মাসুদ রানা ও নাসিম মিলে একটি দড়ি দিয়ে নিচে নেমে দেখতে পেল, সেই একই ধরনের তলোয়ার!
প্রাচীন অভিশাপ
তলোয়ার বের করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে একটি অদ্ভুত ছায়া দেখা দিল। ছায়াটি একজন সৈন্যের মতো, তার চোখে-মুখে তীব্র ক্রোধ। সে বলে উঠল, "আমি সিরাজের সেনা। আমাকে মেরে ফেলা হয়েছিল, এবং এই তলোয়ারগুলোই তার প্রতীক। যে তলোয়ার মুর্শিদাবাদে, আর যে তলোয়ার এখানে, সেগুলো একত্র হলে আমরা মুক্তি পাব।"
তান্ত্রিক জব্বার দ্রুত মন্ত্র পড়তে শুরু করল, আর সেই ছায়াটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, এই দুই তলোয়ারের মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি রয়েছে।
শেষ অধ্যায়
পরদিন সকালে, তারা দুই তলোয়ার একত্র করল এবং স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও ঐতিহাসিকদের জানাল। ইমাম বললেন, "এই তলোয়ারগুলো পলাশির বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন। সেগুলো একত্র হলে সিরাজের সৈন্যদের অভিশাপ শেষ হবে।"
নাসিম এই পুরো যাত্রার ভিডিও তার ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করল। ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেল, আর সবাই এই দুই তলোয়ারের রহস্য সম্পর্কে জানতে পারল।
তারা যখন শ্যামনগরে ফিরে এলো, তখন মাসুদ রানা আর তার বন্ধুরা জানত, তারা কেবল একটা ইতিহাসের গল্প উদ্ধার করেনি, বরং এক অশরীরী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে।